বৃষ্টি
মুহাম্মদ ফজলুল হক
টানা তিন দিন ধরে আকাশ ভেঙে মুষলধারে বৃষ্টি নামছে। থামার কোনো লক্ষণ নেই। আষাঢ়ের এই অবিশ্রান্ত বর্ষণে নদী-নালা, খাল-বিল উপচে পানি থইথই করছে। চারদিকের ঘরবাড়ি ভিজে শ্যাঁতশেঁতে। মোবারকের কাজে যাওয়ার উপায় নেই। অভাবের জাঁতাকলে পিষ্ট সংসারে অনাহার যেন আরও জেঁকে বসেছে। ঘরে চাল-ডাল নেই বললেই চলে। কেরোসিনের কুপিটাও নিভু নিভু। সামান্য গম আর শিমের বিচি সেদ্ধ করে এবং আটার ঝুরি বানিয়ে বাচ্চাদের মুখে তুলে দিয়ে কোনো রকমে দিন পার করছে মোবারকের স্ত্রী।
বাইরে তখনো ঝমঝম শব্দে বৃষ্টি ঝরছে। ঘরের দাওয়ায় স্তব্ধ হয়ে বসে আছে মোবারক আর শাহিদা। দুজনের চোখেই অন্ধকারের ছায়া। একসময় নীরবতা ভেঙে শাহিদা ফিসফিসিয়ে বলল, “বৃষ্টি মাথায় নিয়েই বের হও। দেখ, বাচ্চাদের জন্য কিছু জোগাড় করা যায় কি না!” মনে মনে এ কথা ভাবছিল মোবারক। বাজারে বাজারে গিয়ে সে লবণ বিক্রি করত। যা আয় হতো তা দিয়ে সংসার কোনরকমে চলে যেত। এই দুর্যোগে লবণ নিয়ে কোথায় যাবে সে, তা ভাবতে পারছে না।
এমন সময় বৃষ্টিতে ভিজে জবুথবু হয়ে কবির এসে উপস্থিত হলো। মোবারকের মনে আশার সঞ্চার হলো। সে বুঝতে পারল, নিশ্চয়ই কেউ মারা গেছে। সে খবর দিতেই আসছে কবির। সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “ওস্তাদ, ছোট চৌধুরীর মৃত্যু হয়েছে। কবর খুঁড়তে যাইতে হইব।” কবিরের কথা শুনে মুহূর্তের জন্য মোবারক মন ভালো হয়ে উঠলেও বৃষ্টির কথা ভেবে চুপসে যায় সে। জীবনে এই প্রথম কবর খোঁড়ার কথা শুনে দ্বিধায় পড়ে যায় মোবারক। লবণ বিক্রেতা হলেও কবর খোঁড়ার ডাকে সর্বদাই সে নিজকে নিয়োজিত রাখে। গ্রামের কারো মৃত্যু হলে সবার আগে মোবারকের ডাক পরে। কিছু প্রাপ্তির আশায় কখনো সে এই কাজ করেনি। কবর খোঁড়াকে পবিত্র জ্ঞান মনে করে। আত্মার শান্তি মিলে। প্রয়োজনীয় উপকরণ কেনার জন্য অনেকে ভালো টাকা দেয়। সব খরচ হয় না। বেঁচে যাওয়া টাকা নিজেরা ভাগ করে নেয়।
হঠাৎ তার মন বিষন্ন হয়ে উঠল। বৃষ্টির জন্য বাজারে যেতে না পারায় সে অভাবে পড়েছে বলেই কি ছোট চৌধুরীর মৃত্যুতে তার মন ভালো হয়েছিল? নিজের কাছে নিজেই লজ্জা পেল। নিজেকে ধিক্কার দেয় সে, ছিঃ মোবারক! "তুমি তো এমন ছিলে না! "বাচ্চাদের মুখ, শাহিদার কষ্ট তার চোখে ভেসে উঠল।" সব কিছুর জন্য সে বৃষ্টিকে দায়ী করল। “কিছু কও, ওস্তাদ।” কবিরের কথায় ভাবনায় ছেদ পড়ে। মোবারক দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, “কী কমু কবির, দেখছোস না আকাশটা কেমন ভেঙে পড়ছে!”
খবর শুনে শাহিদা দৌড়ে গিয়ে হাজির হলো চৌধুরী বাড়িতে। নিশ্চয়ই কিছু মিলবে। বৃষ্টির কারণে এলাকার লোকজন আসতে পারছে না। অল্প কয়েকজন বৈঠকখানায় বসে আছে। সে ঘোমটা টেনে বাড়ির ভিতরে গিয়ে ছোট চৌধুরীর গিন্নির ঘরে প্রবেশ করল। শাহিদাকে দেখে গিন্নি যেন প্রাণ ফিরে পেল। মৃতদেহের পাশে থেকে যে ভয় তার মনে জমেছিল, তা কিছুটা কেটে গেল। শাহিদা কাছে যেতেই তাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল গিন্নি। তাঁর কান্না দেখে থমকে যায় শাহিদা। তার বুক কেঁপে উঠল। আজ যদি মোবারকের কিছু হতো!" ভাবনাটা শেষ করার সাহস পেল না সে। দ্রুত নিজকে সামলে দিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে শাহিদা বলল, “কাইন্দো না বুবু, ধৈর্য্য ধরো। বেশি বেশি দোয়া করো। দোয়া ছাড়া আমাদের কিছু করার নেই।”
কিছুটা শান্ত হয়ে চৌধুরী গিন্নি বলল, “এসে ভালো করেছিস বোন, রাত থেকে মাথা একদম কাজ করছে না।”
“তুমি ভেবো না বুবু, আমি যখন আইছি তোমার আর কিছু ভাবতে হবে না।”
“রান্না করা খাবার, আনাজপাতি যা আছে সব নিয়ে যা।” খুশি দেখাল শাহিদাকে। সে গিন্নিকে গোসল করিয়ে, নাক, কান ও গলা খালি করে সাদা কাপড় পরিয়ে দিল। ইতোমধ্যে অনেকে চলে আসে। কেউ কেউ গিন্নিকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠল। এই ফাঁকে শাহিদা বাড়ি ফিরে এলো। খাবার পেয়ে বাচ্চাদের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
মোবারক ও কবির কবর খোঁড়ার যন্ত্রপাতি গুছিয়ে নিয়ে বৃষ্টি মাথায় করে চৌধুরী বাড়ি পৌঁছাল। চৌধুরীর ছোট ছেলে এগিয়ে এসে বলল, “কাকা এসে ভালো করেছ। তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলাম।”
মোবারক উদাস কণ্ঠে বলল, “বৃষ্টি তো থামছে না বাবা, ক্যামনে কী করুম বুঝতে পারতেছি না।”
“যেভাবেই হোক একটা ব্যবস্থা করতেই হবে কাকা।” এই বলে সে কবর খোঁড়ার প্রয়োজনীয় উপকরণ ক্রয়ের জন্য বেশ কিছু টাকা দিল মোবারকের হাতে। অস্বস্তি নিয়ে টাকা গ্রহণ করে কবর খোঁড়ার প্রস্তুতি নিতে তারা ফিরে চলল।
প্রকৃতির নিয়ম আর মানুষের জীবন কখনো থেমে যায় না। বৃষ্টির ধারা আরও বাড়ল। নৌকাযোগে তারা কবরস্থানের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। বৃষ্টি, ঝড়ো বাতাস আর নদীর উত্তাল ঢেউ উপেক্ষা করে নৌকা এগিয়ে চলল কবরস্থানের দিকে। বিল পেরিয়ে নৌকা যখন নদীতে পড়ল, ঢেউয়ের তালে নৌকা দুলতে লাগল। বহু চড়াই উৎরাই পেড়িয়ে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ঢেউকে পিছনে ফেলে তারা কবরস্থানে পৌঁছাল।
এদিকে শাহিদা ঘরের কাজ সেরে আবার চৌধুরী বাড়ি ছুটে গেল। সেখানে তখন শোকের মাতম। বাড়ি ভর্তি মানুষ। মহিলারা গিন্নিকে ঘিরে রেখেছে। বৈঠকখানার ভিতর চৌধুরীর শবদেহ গোসল করানো হয়েছে। সাদা কাপড়ে মোড়া শবদেহও বৃষ্টির ছটায় ভিজে গেছে। মানুষের আনাগোনায় ঘরবাহির কাঁদায় মাখামাখি। আশ্চর্যের বিষয়, এত বৃষ্টির মাঝেও কারও মুখে বৃষ্টি নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই। সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত। মনে হয় কোথাও বৃষ্টি নেই। প্রকৃতির সব নিয়ম স্বাভাবিকভাবে চলছে।
প্রবল বৃষ্টির ধারা যেন আকাশ ফুঁড়ে নেমে আসছে। বৃষ্টির বাধায় মোবারক থেমে যাওয়ার মানুষ নয়। কবর খোঁড়া তার কাছে শুধু কাজ নয়, পবিত্র দায়িত্ব। মানুষের আস্থাও রয়েছে তার ওপর। দিন-দুপুর, সকাল-বিকাল, সন্ধ্যা-রাত্রিতে কবর খোঁড়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে মোবারকের। মাঝে মাঝে বৃষ্টিতেও সে কবর খুঁড়েছে। এমন একটানা বৃষ্টির মধ্যে কখনো পড়েনি। আজকের মাটি যেন শত্রু হয়ে উঠেছে। কোদালের প্রথম আঘাতেই বোঝা গেল, মাটি আর মাটি নেই পুরোটা কাদা আর পানির মিশ্রণ। প্রতি কোপেই মাটির সাথে পানি উঠে আসছে। আরেকটু কাটার পর পাশের দেয়ালের মাটি ধসে পড়ছে। কাদা মাখা পা গর্তের ভেতর থেকে তুলতেই কষ্ট হচ্ছে। কারও পা হঠাৎ পিছলে যাচ্ছে, কেউ হাঁটু পর্যন্ত কাদায় ডুবে যাচ্ছে। বৃষ্টির পানি কপাল বেয়ে চোখে ঢুকে কিছুই দেখা যায় না। কাদা, পানি আর বৃষ্টিতে ভেজা তাদের ক্লান্ত শরীর থেকে যেন ঘাম ঝরছে। তবু কোদাল থামছে না। তারা ক্লান্ত কিন্তু অবসাদ মুক্ত।
হঠাৎ গর্তের এক পাশ ধসে পড়ে। মুহূর্তেই কোমর পর্যন্ত পানি জমে যায় গর্তে। কেউ হাঁপাতে লাগল, কেউ ক্লান্ত হয়ে কোদালে ভর দিল। মোবারক বুঝল এভাবে কবর কখনোই তৈরি হবে না। সে চিৎকার করে বলল, “মাটি কাটা বন্ধ কর!”
তার মাথায় হঠাৎ বুদ্ধি খেলে গেল। সে বাঁশ কেটে একটি বড় খাঁচা তৈরি করতে বলল। বৃষ্টির মাঝেই তারা দ্রুত বাঁশ কাটতে লাগল। বাঁশ কাটতে কাটতে হাত কেটে গেলেও তারা অল্প সময়ের মধ্যে কবরের মাপে বাঁশের খাঁচা তৈরি করল। খাঁচা গর্তের ভেতর নামাতে গিয়ে কারো পা পিছলে গেল। কাদা ছিটকে চোখে-মুখে ঢুকে গেল। তবু তারা দমল না। সবাই মিলে খাঁচাটি শক্ত করে মাটিকে পুঁতল যেন চারপাশের কাদা-মাটি ধসে না পড়ে।
তারপর শুরু হলো আরেক যুদ্ধ। খাঁচার ভেতর জমে থাকা পানি আর কাদা তোলা। বালতি দিয়ে পানি তুলছে, হাতে কাদা ছুড়ছে, আবার পানি ঢুকছে। যেন শেষই হয় না। তবু ধীরে ধীরে গর্তের তলা দেখা দিতে লাগল। অবশেষে তারা কবরটি মোটামুটি প্রস্তুত করে নিঃশ্বাস ফেলে স্বস্তি পেল। বৃষ্টি না থামলেও অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে তারা লাশের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
দুপুর হয়ে গেলেও বৃষ্টির তোপে সূর্য যেন অদৃশ্য। প্রকৃতি সূর্যকে আড়াল করে রাখতে পারলেও বৃষ্টি মানুষকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। সারা গ্রামের মানুষ জড়ো হয়েছে চৌধুরীর জানাজায় অংশ নিতে। বৃষ্টি আর মানুষের ঢল একাকার হয়ে জানাজা শেষ হলো। বৃষ্টিতে মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরা দেখে মনে হচ্ছে যেন কিছুই হয়নি।
জানাজা শেষে সবাই চলে গেলেও কিছু মানুষ থেকে গেল শবযাত্রায় অংশ নিতে। শব নিয়ে তারা নৌকাঘাটে যায়। নৌকায় শবদেহ তুলে রওনা হয় কবরস্থানের দিকে। পাশাপাশি কয়েকটি নৌকা ছুটে চলে। মনে হয় শবদেহকে স্যালুট করতে করতে মার্চ করে চলছে সৈন্যদল। বৃষ্টি যেন হেসে উঠেছে শবযাত্রা দেখে। সে তার ধারা আরও বাড়িয়ে দিয়ে শবযাত্রায় সামিল হয়।
চৌধুরী বাড়ির উঠানে দানের হাট বসে। বস্তা বস্তা ধান-চাল ও নগদ টাকা বিতরণ করা হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে যারা তিন দিন কাজে যেতে পারেনি, যাদের চুলায় আগুন জ্বলেনি সবাই ভিড় করেছে এখানে। শোকের মাঝে এমন দান মানুষকে সুখী করছে।
অদ্ভুত এক দৃশ্য! একজনের মৃত্যু শত মানুষের ক্ষুধা নিবারণের ব্যবস্থা করে দিল। মুহূর্তেই তাদের বুকের ভেতর জমে থাকা অনাহারের কষ্ট দূর হয়ে গেল। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে, কাদামাখা পায়ে, হাসিমুখে তারা ফিরে যেতে লাগল।
শাহিদাও পিছিয়ে থাকল না। এই বাড়িতে কাজ করার সুবাদে ও মোবারকের পরিচয়ের কারণে গিন্নি তাকে আলাদা করে ডেকে নিল। শাড়ি, চাল-ডাল, নানান খাদ্যসামগ্রীসহ কিছু টাকা তার হাতে তুলে দিল। ভেজা আঁচলে বারবার চোখ মুছতে মুছতে শাহিদা বারবার চৌধুরী বাড়ি ও নিজের বাড়িতে যাতায়াত করতে লাগল। বৃষ্টি আর পায়ে লেগে থাকা কাদা তার আসা-যাওয়ায় কোন বাধা হতে পারল না।
প্রচণ্ড ঢেউ আর তুমুল বৃষ্টি কোনোভাবেই শবযাত্রা রুখতে পারেনি। শবদেহ নিয়ে নৌকা আপন গতিতে এগিয়ে চলে পৌঁছে যায় কবরস্থানে। মোবারক যেন এই অপেক্ষায় ছিল। সে নতুন করে কবরের ওপর পলিথিন ধরে দ্রুত পানি তুলতে বলল। পানি তুলতে সময় লাগল না। বৃষ্টি ও ঝড়ো বাতাসের কথা ভুলে তারা স্বসম্মানে শবদেহ দাফন করল।
দাফন শেষ হতেই নিজেকে ভারমুক্ত মনে হল মোবরকের। নীরবে ভিড় থেকে সরে গিয়ে সে ধীরে ধীরে নদীতে নামল। যখন মোবারক নদীর পানিতে ডুব দিল, তখন ওপর থেকে পড়া বৃষ্টির ফোঁটা তার কানে এক অদ্ভুত চেনা সুর তুলল। মুহূর্তে মোবারক তার শৈশবে ফিরে গেল। সব ক্লান্তি ভুলে মনের আনন্দে সেই সুরের তালে নিজকে বিলিয়ে দিয়ে ডুবসাঁতারে মগ্ন হয়ে রইল। তার মনে হলো "বৃষ্টি, মৃত্যু আর জীবন সব একই চক্রের অংশ। এই চক্র মানুষের জীবন থামালেও জীবনের চলা থামাতে পারে না।”
দাফন শেষে সবাই যে যার ঘরে ফিরে গেল। প্রকৃতিতে তখনো বৃষ্টি ঝরছে। সেই বৃষ্টি আর কারও জীবনে কোনো বাধা হয়ে রইল না। ধারাবাহিক বৃষ্টির মধ্যেও সব কিছুই চিরচেনা নিয়মে সচল হয়ে উঠল।
মুহাম্মদ ফজলুল হক
শিক্ষক, ভৈরব সরকারি মহিলা কলেজ
ভৈরব, কিশোরগঞ্জ, বাংলাদেশ।
এখনো কোনো মন্তব্য অনুমোদিত হয়নি। আলোচনার সূচনা করতে প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!