betarbanglabd@gmail.com +৮৮০২-৪৪৮১৩০৫৩
Logo

বেতার প্রকাশনা

শব্দের সীমা পেরিয়ে—ত্রিমাত্রিক বাংলাদেশ বেতার

গল্প

গন্ধ

পল্লব শাহরিয়ার 7/22/2026 7 বার দেখা হয়েছে 13 min read 0 মন্তব্য 0 প্রতিক্রিয়া
গন্ধ
নিবন্ধটি শুনুন / অডিও শুনুন (TTS)
1.0x

গন্ধ

পল্লব শাহরিয়ার




বসুন্ধরার এই আটতলার ফ্ল্যাটে অনিমেষ যখন প্রথম শিফট করে, তখন তার মনে হয়েছিল সে পৃথিবীর চূড়ায় বসে আছে। কাঁচের দেয়াল দিয়ে পুরো শহরটাকে পায়ের নিচে দেখা যায়। সাতাশ বছরের এক সফল পুরুষ, যার মাসিক ইনকাম সাত অংকের ঘরে, তার জন্য এর চেয়ে ভালো ঠিকানা আর কিছু হতে পারত না। কিন্তু গত সোমবার থেকে এই স্বর্গরাজ্য নরকে পরিণত হতে শুরু করেছে।

গন্ধটা প্রথম পেয়েছিল সে সোমবার রাতে।

অনিমেষ তখন একটা প্রেজেন্টেশন ফাইল দেখছিল। হঠাৎ নাকে এল একটা ভ্যাপসা গন্ধ। ঠিক মরা ইঁদুরের মতো নয়, বরং যেন ভিজে স্যাঁতসেঁতে ঘরে কোনো মাংসের টুকরো অনেকদিন ধরে পড়ে থেকে পচে ফুলে উঠেছে। অনিমেষ ভ্রু কুঁচকে চারপাশটা দেখল। তার ফ্ল্যাটে ধুলো ঢোকার জো নেই, কারণ সেন্ট্রাল এসি সবসময় চলে। ভ্যাকিউম ক্লিনার দিয়ে রোজ ঘর পরিষ্কার হয়। তাহলে এই গন্ধ কোত্থেকে এল?

সে রান্নাঘরের ড্রেন, ফ্রিজের নিচের ট্রে—সব পরীক্ষা করল। কিছুই নেই। সেদিন রাতে পারফিউম ছিটিয়ে সে কোনোমতে ঘুমিয়েছিল। কিন্তু মঙ্গলবার সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর দেখল গন্ধটা আরও গাঢ় হয়েছে। শুধু গাঢ় নয়, গন্ধটা যেন এখন স্পর্শ করা যায়। বাতাসটা ভারী হয়ে আছে।

অনিমেষের মনে পড়ল, সে সকালে যখন কফি বানাচ্ছিল, কাপে চুমুক দিতেই তার গা গুলিয়ে এল। কফির সুবাস ছাপিয়ে সেই উৎকট আঁশটে গন্ধটা তার পেটের ভেতর পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছিল। সে বেসিনে কফিটা ঢেলে দিল। তার মনে হলো, কফিটা নয়, সে আসলে নিজের ভেতরের কোনো পচানি গিলে ফেলছে।


দুই

অফিসে গিয়েও শান্তি নেই। অনিমেষ লক্ষ্য করল, তার কেবিনে যখনই কোনো সাবর্ডিনেট ঢুকছে, তারা নাকে রুমাল চাপা দিচ্ছে বা অস্বস্তিতে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। তার প্রিয় কলিগ রিয়া লাঞ্চের সময় যখন তার পাশে এসে বসল, কয়েক সেকেন্ড পরেই সে মুখটা সরিয়ে নিল।

— অনিমেষ, তুমি কি কোনো নতুন কোলন মেখেছ? খুব স্ট্রং আর... কেমন যেন অদ্ভুত গন্ধ! রিয়া সরাসরি বলেই ফেলল।

অনিমেষ অপ্রস্তুত হয়ে হাসল। আসলে ফ্ল্যাটে মনে হয় মরা ইঁদুর-টিদুর পড়েছে, জামাকাপড়ে হয়তো সেই গন্ধটা বসে গেছে।

কিন্তু সে জানে সে মিথ্যে বলছে। সকালে সে কড়া গরম জলে দুবার গোসল করেছে। দামি শ্যানেল পারফিউম মেখেছে। তবুও এই গন্ধ তাকে ছাড়ছে না কেন? সে বাথরুমে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল। নিজের গায়ের গন্ধ শুঁকল সে। না, বাইরে থেকে কোনো গন্ধ নেই। কিন্তু সে যখনই শ্বাস ছাড়ছে, তার মনে হচ্ছে তার ফুসফুসের ভেতর থেকে এক ঝাঁক মাছি ভনভন করে বেরোতে চাইছে।

সেই রাতে শুরু হলো নতুন উপদ্রব। অনিমেষ যখন বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছে, তখন চারপাশের নিস্তব্ধতার মধ্যে সে শুনতে পেল একটা ঘড়ঘড়ে আওয়াজ। ঠিক যেন কেউ বালিশের তলায় জলভরা ফুসফুস নিয়ে কষ্ট করে নিঃশ্বাস টানছে। সে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। কেউ নেই। ঘুটঘুটে অন্ধকারে শুধু এসি-র নীল আলোটা জ্বলছে।

হঠাৎ তার মনে পড়ল চার বছর আগের সেই হাইওয়ে। বিশ্বরোড। ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছিল সেদিন। অনিমেষ তখন নতুন গাড়ি কিনেছে। নেশার ঘোরে গাড়ি চালাচ্ছিল সে। হঠাৎ চাকার নিচে একটা বিশ্রী আওয়াজ। ব্রেক কষতেই দেখল, একটা মাঝবয়সী লোক আধমরা হয়ে পড়ে আছে। লোকটার পেটটা চাকার নিচে পিষে গিয়েছিল। অনিমেষ ভয়ে কাঁপছিল। সে লোকটাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারত। কিন্তু তার কেরিয়ার, তার জেল হওয়ার ভয় তাকে জাপটে ধরল।

সেদিন ওই বৃষ্টিতে লোকটাকে হিঁচড়ে রাস্তার ধারের একটা খোলা ম্যানহোলের ভেতর ফেলে দিয়ে পালিয়ে এসেছিল সে। লোকটা তখনও মরেনি। ম্যানহোলের ভেতর থেকে লোকটা যখন অনিমেষের দিকে চেয়ে হাত বাড়িয়েছিল, সেই নর্দমার জল আর পচা পলিমাটির যে গন্ধটা নাকে এসেছিল—আজকের এই গন্ধটা হুবহু এক!


তিন

বুধবার সকালে অনিমেষ আবিষ্কার করল তার শরীরের প্রথম পরিবর্তন। গোসল করতে গিয়ে দেখল তার উরুর ওপরের চামড়াটা কুঁচকে গেছে, অনেকটা পুরনো কাগজের মতো। সে যখন সাবান ঘষতে গেল, একটা বড় অংশ চামড়া বিনা রক্তপাতে তার হাতের মুঠোয় চলে এল। কোনো ব্যথা নেই, কোনো জ্বালা নেই। কিন্তু চামড়াটার নিচে যা দেখল, তাতে অনিমেষের আর্তনাদ বাথরুমের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল।

চামড়ার নিচে পেশি বা রক্ত নেই। সেখানে থকথক করছে কালচে ধূসর রঙের একটা পদার্থ। অনেকটা পচে যাওয়া লিভারের মতো। আর সেখান থেকেই তীরের মতো ছুটে আসছে সেই সর্বনাশা পচাগন্ধ।

সে পাগলের মতো ডাক্তার মিত্রকে ফোন করল। ডাক্তারবাবু, আমার গায়ের চামড়া খসে পড়ছে! ভেতরের মাংস পচে গেছে! আমি... আমি কি মরে যাচ্ছি?

ডাক্তার মিত্র অভিজ্ঞ মানুষ। তিনি শান্ত গলায় বললেন, অনিমেষ, শান্ত হও। এটা হয়তো কোনো বিরল ফাঙ্গাল ইনফেকশন বা নেক্রোসিস হতে পারে। তুমি এখনই ক্লিনিকে এসো।

অনিমেষ গাড়ি বের করল। কিন্তু লিফটে উঠতেই পাশের ফ্ল্যাটের এক মহিলা আর তার বাচ্চাটা আর্তনাদ করে উঠল। বাচ্চাটা কাঁদতে কাঁদতে বলল, মা, পচা মাংস! মা, পচা মাংস!

অনিমেষের বুঝতে দেরি হলো না—সে এখন এক চলন্ত শবদেহ। তার ওপরের জেল্লাদার কর্পোরেট মোড়কটা ধীরে ধীরে ছিঁড়ে পড়ছে, আর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে চার বছর ধরে লুকিয়ে রাখা সেই আদিম পচানি।


চার

ডাক্তার মিত্রের ক্লিনিকে পৌঁছানোর আগেই অনিমেষ বুঝতে পারল, অবস্থা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এসিরুমে বসে থাকা সত্ত্বেও তার কপাল দিয়ে চটচটে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। সেই ঘামও স্বাভাবিক নয়; তা যেন পচা নর্দমার জলের মতো দুর্গন্ধযুক্ত। ওয়েটিং রুমে বসে থাকা অন্য রোগীরা একে একে উঠে দূরে গিয়ে দাঁড়াতে লাগল। কেউ কেউ নাকে রুমাল চেপে আড়চোখে অনিমেষকে দেখছে। তাদের চোখে ঘৃণা আর আতঙ্ক।

ডাক্তারের চেম্বারে ঢোকা মাত্রই ডাক্তার মিত্র চমকে উঠলেন। তিনি মাস্ক পরা সত্ত্বেও হাত দিয়ে নাক ঢাকলেন। অনিমেষ! এ কী অবস্থা তোমার? তোমার গায়ের এই গন্ধটা তো... এটা তো কোনো জীবিত মানুষের হতে পারে না!

অনিমেষ কম্পিত হাতে তার উরুর সেই ক্ষতটা দেখাল। ডাক্তার মিত্র গ্লাভস পরে জায়গাটা পরীক্ষা করতে গিয়ে শিউরে উঠলেন। তিনি চিমটে দিয়ে ক্ষতটা একটু নাড়াচাড়া করতেই সেখান থেকে একটা সাদাটে লার্ভা বা কীটের মতো কিছু বেরিয়ে এল। অবিশ্বাস্য! নেক্রোসিস হলেও টিস্যু এভাবে পচে যাওয়ার কথা নয়। আর এই পোকাগুলো... এগুলো তো সাধারণ কোনো প্যারাসাইট নয়। এগুলো ঠিক সেই ধরনের মাছি বা পোকা যারা মৃতদেহের ওপর বাসা বাঁধে।

অনিমেষ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। ডাক্তার মিত্র ব্লাড টেস্ট আর বায়োপসির কথা বললেন, কিন্তু অনিমেষ জানে কোনো টেস্টেই কিছু ধরা পড়বে না। তার মনে হচ্ছে, তার হাড়ের ভেতর মজ্জাগুলো এখন কালো আলকাতরায় পরিণত হয়েছে। সে যখন ক্লিনিক থেকে বেরিয়ে আসছিল, তখন তার কানে এল ডাক্তার মিত্র তার অ্যাসিস্ট্যান্টকে বলছেন, ঘরটা এখনই স্যানিটাইজ করো। মরা মানুষের গন্ধ কিছুতেই যাচ্ছে না।


পাঁচ

ফ্ল্যাটে ফিরে অনিমেষ নিজেকে অন্ধকার ঘরে বন্দি করে ফেলল। আলো সহ্য হচ্ছে না। তার মনে হচ্ছে আলো পড়লে পচনটা আরও দ্রুত ছড়াচ্ছে। সে শার্টটা খুলতেই দেখল, তার পিঠের চামড়া বড় বড় চাঙড়ের মতো খসে কার্পেটে পড়েছে। অথচ কোনো ব্যথা নেই। ব্যথার বোধ হারিয়ে যাওয়াটাই সবচেয়ে বড় আতঙ্ক।

সেদিন রাতে সে আর ঘুমোতে পারল না। তন্দ্রার ঘোরে সে দেখল, তার ঘরের কোণে সেই ম্যানহোলটা ফুটে উঠেছে। সেখান থেকে উঠে আসছে সেই লোকটা। লোকটার মুখটা অর্ধেক নেই, চোয়ালের হাড় বেরিয়ে আছে। লোকটা তার দিকে তাকিয়ে একটা ভাঙা গলায় হাসল। কেমন লাগছে অনিমেষ? চার বছর ধরে ওই অন্ধকারের ভেতর আমি একটু একটু করে পচেছি। তোমার জন্য আমার কোনো ঘৃণা নেই। আমি শুধু চেয়েছিলাম আমার সেই পচনটা কাউকে দিয়ে যেতে। আজ তুমি আমার সেই উত্তরাধিকারী।

অনিমেষ চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু দেখল তার জিভটা ফুলে মুখে আঁটছে না। সে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ড্রেসিং টেবিলের হালকা আলোয় সে দেখল, তার মুখের একদিকের চামড়া ঝুলে পড়েছে। গালের পাশ দিয়ে দাঁতের মাড়ি আর হাড় দেখা যাচ্ছে। তার সুপুরুষ চেহারাটা এখন একটা বীভৎস মুখোশ।

হঠাৎ তার মনে হলো, পেটের ভেতর কিছু একটা নড়াচড়া করছে। তীব্র অস্বস্তিতে সে নখ দিয়ে নিজের পেটটা আঁচড়াতে শুরু করল। চুলকানি নয়, এক ধরনের তীব্র জ্বালা। সে নিজের নখ দিয়ে পেটের নরম হয়ে যাওয়া চামড়াটা টেনে ছিঁড়ে ফেলল।

কোনো চিৎকার বেরোল না তার গলা দিয়ে। বদলে একটা ঘড়ঘড়ে শব্দ হলো। তার পেটের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল কয়েকটা দলা পাকানো ভিজে ন্যাকড়া আর সেই হাইওয়েতে লোকটার গায়ে থাকা জামার একটা টুকরো। তার শরীর যেন এখন একটা ডাস্টবিন, যেখানে চার বছর আগের সেই অপরাধের সব প্রমাণ একে একে জমা হয়েছে।


ছয়

পরদিন সকালে অনিমেষ আবিষ্কার করল, সে আর শক্ত কোনো খাবার গিলতে পারছে না। সব খাবারই তার জিভে ঠেকলে মনে হচ্ছে পচা নাড়িভুঁড়ি। সে আয়নায় দেখল তার একটা চোখের মণি সাদা হয়ে গেছে। পচন এখন মস্তিষ্কের দিকে এগোচ্ছে।

বিকেলের দিকে তার ফ্ল্যাটের বেল বাজল। অফিসের পিয়ন এসেছে কিছু ফাইলে সই নিতে। অনিমেষ দরজা খুলল না। ওপার থেকে পিয়নের আওয়াজ পাওয়া গেল স্যার? ভেতরে আছেন? কী বিশ্রী গন্ধ স্যার! কেউ কি মারা গেছে ভেতরে?

অনিমেষ দরজার ওপাশ থেকে গোঙাতে গোঙাতে বলল, চলে যাও! আমি অসুস্থ! কিন্তু তার গলার স্বর শুনে পিয়ন ভয় পেয়ে গেল। সে ভাবল স্যার হয়তো স্ট্রোক করেছেন। সে সোসাইটির সিকিউরিটিকে ডাকল।

ভেতরে অনিমেষ তখন উন্মাদ হয়ে গেছে। সে তার বাথরুমের বড় ছুরিটা নিয়ে নিজের শরীরের পচা অংশগুলো কেটে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করছে। সে ভাবছে যদি পচা মাংসগুলো ফেলে দেওয়া যায়, তবে হয়তো সে মুক্তি পাবে। কিন্তু সে যতই কাটছে, ভেতর থেকে ততই কালচে আঠালো তরল আর পোকা বেরিয়ে আসছে।

তার মনে হলো, তার শরীরের প্রতিটা কোষে সেই লোকটার স্মৃতি ঢুকে গেছে। সে নিজের ডান হাতের কবজিটা টেবিলের ওপর রেখে ছুরি দিয়ে কোপ মারল। হাতটা আলাদা হয়ে মেঝেতে পড়ল, কিন্তু কোনো রক্ত বেরোল না। বিচ্ছিন্ন হাতের আঙুলগুলো মেঝের ওপর পোকার মতো কিলবিল করে নড়তে লাগল।

অনিমেষ হাসতে শুরু করল। এক বিকট, অমানুষিক হাসি। তার সেই হাসির সাথে সাথে নাক আর কান দিয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল তরল মাংস। সে বুঝতে পারল, সে আসলে মরছে না। মৃত্যু তো অনেক সহজ। তাকে এই পচনশীল শরীরের ভেতরেই বছরের পর বছর বেঁচে থাকতে হবে। এটাই তার বিচার।


সাত

বাইরে তখন সিকিউরিটি আর প্রতিবেশীদের জটলা বাড়ছে। দরজায় ধাক্কা পড়ছে সজোরে। কিন্তু অনিমেষের কানে সেই শব্দ পৌঁছাচ্ছে না। তার কানে এখন কেবল একটাই শব্দ—হাজার হাজার মাছির ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ। তার শোবার ঘরের দেওয়ালগুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে, প্লাস্টারের ফাটল দিয়ে চুইয়ে পড়ছে সেই কালচে দুর্গন্ধযুক্ত রস।

অনিমেষ মেঝেতে পড়ে ছটফট করছে। তার শরীরের অর্ধেক এখন কঙ্কালসার, আর বাকি অর্ধেকের মাংসগুলো থকথকে কাদার মতো ঝুলে আছে। সে নিজের বাঁ হাত দিয়ে নিজের পেটের নাড়িভুঁড়িগুলো টেনে বের করার চেষ্টা করল। সে দেখতে চাইল, তার ভেতরে কোনো আত্মা অবশিষ্ট আছে কি না। কিন্তু সেখানে কেবল একরাশ কালো কাদা আর কয়েকটা ছোট ছোট মানুষের দাঁত। সেগুলো কি সেই লোকটার? নাকি তার নিজেরই অপরাধগুলো মূর্ত হয়ে উঠেছে?

হঠাৎ তার মনে হলো, সে একা নয়। এই পচা মাংসের স্তূপের ভেতরেই কেউ একজন কথা বলছে। সে নিজের বুকের খোলা গর্তটার দিকে তাকাল। সেখানে তার হৃদপিণ্ডটা এখন আর নেই, বদলে একটা ছোট আয়নার মতো কিছু দেখা যাচ্ছে। সেখানে ফুটে উঠছে সেই চার বছর আগের বর্ষারাতে হাইওয়ের দৃশ্য। কিন্তু এবারের দৃশ্যটা আলাদা। সে দেখছে, গাড়িটা সে চালাচ্ছে না, গাড়িটা চালাচ্ছে সেই মৃত লোকটা, আর চাকার নিচে পিষে যাচ্ছে স্বয়ং অনিমেষ!

না! এটা হতে পারে না! সে চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু তার চোয়ালটা আলগা হয়ে খসে পড়ল মেঝেতে। একটা বিশ্রী শব্দে হাড়টা কার্পেটের ওপর আছড়ে পড়ল।


আট

বাইরে থেকে দরজা ভাঙার শব্দ এল। মিস্ত্রি শাবল দিয়ে লকটা ভেঙে ফেলেছে। একদল মানুষ হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকল। কিন্তু ঢোকার সাথে সাথেই সবাই বমি করে দিল। সেই গন্ধটা বাতাসের নয়, সেটা যেন একটা অদৃশ্য বিষাক্ত গ্যাস যা ফুসফুস জ্বালিয়ে দিচ্ছে।

পুলিশ অফিসার মন্ডল মাস্ক পরে ভেতরে ঢুকলেন। টর্চের আলোটা যখন শোবার ঘরে পড়ল, তিনি স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন।

মেঝের ওপর অনিমেষ নেই। সেখানে পড়ে আছে একটা বিশাল চামড়ার খোলস। ঠিক যেন কোনো সাপ তার খোলস ছেড়ে চলে গেছে। কিন্তু সেই খোলসটা মানুষের আকৃতির। চামড়াটার ভেতর কোনো মাংস নেই, হাড় নেই। শুধু পাতলা একটা স্তূপ।

স্যার, এই দেখুন! এক কনস্টেবল চিৎকার করে উঠল।

টর্চের আলো পড়ল দেওয়ালের বড় আয়নাটার ওপর। আয়নার ভেতরে দেখা যাচ্ছে অনিমেষকে। সে সম্পূর্ণ নগ্ন, তার শরীরটা নিখুঁত, সুন্দর। কিন্তু আয়নার ভেতরের অনিমেষটা হাত বাড়িয়ে ডাকছে। আর তার পায়ের কাছে আয়নার ভেতরেই পড়ে আছে সেই চার বছর আগের মৃত লোকটা। লোকটা এখন হাসছে।

হঠাৎ আয়নার ভেতরের অনিমেষটা নিজের গাল কামড়ে এক টুকরো মাংস ছিঁড়ে নিল। তারপর সেটা চিবোতে চিবোতে আয়নার গ্লাসটা নখ দিয়ে আঁচড়াতে শুরু করল। বাইরে যারা দাঁড়িয়ে ছিল, তারা শুনতে পেল কাঁচের ওপর নখের সেই কর্কশ আওয়াজ।


নয়

পুলিশ ঘটনার কোনো কিনারা করতে পারল না। ডায়েরিতে লেখা হলো— নিখোঁজ। কিন্তু সেই ফ্ল্যাটটা আর কেউ কোনোদিন ভাড়ায় নিতে পারেনি। প্রতি পূর্ণিমায় সেই সাতাশ তলার বন্ধ ফ্ল্যাটের করিডোর দিয়ে এক অসহ্য পচাগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। লোকে বলে, মাঝরাতে নাকি দরজার ওপাশ থেকে একটা ঘড়ঘড়ে আওয়াজ পাওয়া যায়— আমাকে এখান থেকে বের করো! আমি এখনো মরিনি!

সবচেয়ে অদ্ভুত ঘটনাটা ঘটল এক মাস পর। সেই হাইওয়ের ধারের ম্যানহোলটা যখন মিউনিসিপ্যালিটির লোক পরিষ্কার করতে গেল, তারা সেখানে একটা নতুন কঙ্কাল খুঁজে পেল। কঙ্কালটা অদ্ভুতভাবে একটা দামি রোলেক্স ঘড়ি পরা ছিল— যা ঠিক অনিমেষের সেই প্রিয় ঘড়িটার মতো। কঙ্কালটার শরীরে কোনো মাংস ছিল না, কিন্তু হাড়ের খাঁজগুলো থেকে তখনও তাজা পচা মাংসের গন্ধ আসছিল।

অনিমেষ এখন আর কোনো মানুষ নয়। সে একটা চিরস্থায়ী দুর্গন্ধ। সে একটা জীবন্ত পচন, যা কেবল তার নিজেরই যন্ত্রণাকে আস্বাদন করে চলেছে অনন্তকাল ধরে। সে মুক্তি চেয়েছিল মরণে, কিন্তু তার পাপ তাকে উপহার দিয়েছে এক অনন্তকাল ধরে চলতে থাকা পচনশীল বেঁচে থাকা।



আপনার অনুভূতি জানান
মোট প্রতিক্রিয়া: 0
নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আলোচনা ও মন্তব্য (0)

এখনো কোনো মন্তব্য অনুমোদিত হয়নি। আলোচনার সূচনা করতে প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!

মন্তব্য করুন